হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) ও তাঁর পরিবারের মরদেহের ওপর পবিত্র জামকারান মসজিদে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলীর জানাজার নামাজে ইমামতি কেবল একটি ইবাদতমূলক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং তা গভীর দার্শনিক (হিকমি) ও ইরফানি বার্তা বহন করেছে। এ উপলক্ষে হযরত মাসূমা (সা.আ.) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম হামিদরেজা সুরুরিয়ানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলীর চিন্তাধারার আলোকে «حقیقتِ بندگی» (প্রকৃত দাসত্ব), বিপ্লবের শহীদদের জীবনাদর্শ এবং «حیّ متألّه» (হাইয়্যুন মুতাআল্লিহ)—এই অভিনব ধারণাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আলোচনার প্রধান বিষয়সমূহ
• নামাজের ইরফানি বিশ্লেষণ: নামাজকে একত্ব ও পরিপূর্ণ দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পুনর্বিবেচনা।
• এবং «حیّ متألّه»—এক নতুন সংজ্ঞা: বস্তুবাদী মানব-সংজ্ঞার বিপরীতে আল্লাহমুখী মানুষের অবস্থান ও পরিচয়ের ব্যাখ্যা।
• সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইবাদতের একত্ব: শহীদদের জীবনাদর্শে মুজাহাদা, শাহাদাত এবং আল্লাহমুখী জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ।
بسم الله الرحمن الرحيم
«أحدیت» থেকে ইবাদতের একত্ব: «موحّد» মানুষের বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ
নামাজ সম্পর্কে বলতে গেলে, এটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের অস্তিত্বে আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন। এ সত্যের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত হলেন নিষ্পাপ ইমামগণ (আ.)। তাঁদের পর রয়েছেন তাঁদের প্রতিনিধিগণ এবং যাঁরা তাঁদের পবিত্র সান্নিধ্যের নৈকট্য লাভ করেছেন; যেমন সালমান ফারসি, যাঁকে «مِنّا أهل البيت» (তিনি আমাদের আহলুল বাইতের অন্তর্ভুক্ত) বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মহান আল্লাহর অন্যতম গুণ হলো «أحدیت»—এমন একটি গুণ, যার দিকে আল্লাহর সব পরিপূর্ণ গুণাবলি প্রত্যাবর্তন করে। এটি এমন এক সত্তার পরিচয় বহন করে, যিনি একক এবং যার কোনো সমকক্ষ নেই।
পবিত্র কুরআনের ঘোষণা—
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
এর অর্থ হলো, মহান আল্লাহ একক; তাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই। সমগ্র অস্তিত্ব সেই অসীম ঐশী সত্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার যে গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলো মূলত তাঁর «موحّد» (একনিষ্ঠ তাওহীদবাদী) হওয়ারই বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ, যখন মানুষ প্রকৃত অর্থে মুওয়াহহিদে পরিণত হয়, তখন তার ইবাদতও একনিষ্ঠ ও অবিভক্ত হয়ে ওঠে। যেমন মহান আল্লাহ তাঁর উলুহিয়্যতে একক ও অদ্বিতীয়, তেমনি তাঁর প্রকৃত বান্দাও দাসত্বের ক্ষেত্রে—জীবনের সব অঙ্গন ও অস্তিত্বের সব স্তরে—ইখলাস, একত্ব এবং পরিপূর্ণতার মর্যাদায় উপনীত হয়।

সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইবাদতের একত্ব
প্রকৃত দাসত্ব («بندگیِ حقیقی») একটি সরল, অবিভাজ্য ও একক সত্য; এর কোনো সমতুল্য («عدیل») বা দ্বিতীয় কিছু কল্পনা করা যায় না। যখন «حقیقتِ بندگی» মানুষের অস্তিত্বে বাস্তবায়িত হয়, তখন এই একক সত্য জীবনের নানামুখী ক্ষেত্র ও বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। আল্লাহর পথে সংগ্রাম (مجاهدت), শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা (شهادتطلبی) এবং আল্লাহমুখী জীবন—প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে একই একক দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ।
«حیّ متألّه»: নির্বাচিত মানুষের জীবনে প্রকৃত দাসত্বের পুনর্পাঠ
এই প্রেক্ষাপটে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলীর ব্যবহৃত «حیّ متألّه» পরিভাষাটি তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অত্যন্ত সুন্দর, অভিনব ও গভীর সংজ্ঞা উপস্থাপন করে। এটি মানুষের প্রচলিত সংজ্ঞাগুলোর বিপরীতে এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
প্রাচীন দার্শনিক ও যুক্তিবিদদের দৃষ্টিতে «حیوان ناطق» (বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী) মানুষের সুপরিচিত সংজ্ঞা। কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মানুষ তখনই প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়, যখন সে «متألّه» হয়; অর্থাৎ মহান আল্লাহর দাসত্ব ও ইবাদতকে সানন্দে গ্রহণ করে এবং নিজের জন্য আল্লাহর বান্দা হওয়া ছাড়া অন্য কোনো নাম, পরিচয়, বৈশিষ্ট্য বা স্বাতন্ত্র্য দাবি করে না।
এটিই সেই সত্য, যা আমরা প্রতিদিন ফরজ নামাজে পুনরাবৃত্তি করি এবং যার মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয় প্রদান করি—
أشهد أن محمداً عبده ورسول الله
অর্থাৎ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল।
অর্থাৎ, মহানবী (সা.) আল্লাহর রাসূল হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর বান্দা।
অনুরূপভাবে, আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) যখন নিজের পরিচয় তুলে ধরেন, তখন তিনি সর্বপ্রথম নিজের «عبدالله» (আল্লাহর বান্দা) পরিচয়ই উল্লেখ করেন। একইভাবে হযরত ঈসা (আ.)-ও নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই তাঁর দাসত্বের কথা ঘোষণা করেন।
অতএব, ইসলামের অকাট্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষার আলোকে বলা যায়, যেমন মহান আল্লাহর অন্যতম মৌলিক গুণ «أحدیت», যার দিকে তাঁর সব পরিপূর্ণতা (کمال) ও সৌন্দর্যের (جمال) গুণাবলি প্রত্যাবর্তন করে—যেমন সূরা ইখলাসে ঘোষণা করা হয়েছে—
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
তেমনি মানুষের ক্ষেত্রেও «موحّد بودن» (একনিষ্ঠ তাওহীদবাদী হওয়া) এমন একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, যার দিকে দাসত্ব ও ইবাদতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব গুণাবলি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন করে।
প্রকৃতপক্ষে এটিই মানবসৃষ্টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”
আপনার কমেন্ট